| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি

রিপোর্টারের নামঃ দৈনিক শিবপুর দর্পণ
  • আপডেট টাইম : 15-10-2026 ইং
  • 3350 বার পঠিত
গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহিত ছবি

গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি

১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস         |

বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশে গ্রামীণ নারীর অবদান অপরিসীম। ভোরের আলো ফোটার আগেই যাঁদের কর্মব্যস্ত দিন শুরু হয়, যাঁরা সংসার সামলানোর পাশাপাশি কৃষিকাজ, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি লালন-পালন, খাদ্য উৎপাদন, হস্তশিল্প এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন—তাঁরাই আমাদের গ্রামীণ সমাজের অন্যতম চালিকাশক্তি। অথচ তাঁদের অনেকের শ্রম, মেধা ও অবদান যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবসে এই বাস্তবতা নতুন করে উপলব্ধি করা জরুরি।

গ্রামীণ নারীরা শুধু পরিবারের গৃহস্থালি কাজেই সীমাবদ্ধ নন; তাঁরা কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, পারিবারিক সঞ্চয় এবং সন্তানদের শিক্ষা ও নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য নারী সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নিজেদের দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে পরিবারকে এগিয়ে নিচ্ছেন। কেউ সবজি চাষ করছেন, কেউ দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করছেন, কেউ সেলাই বা হস্তশিল্পের মাধ্যমে আয় করছেন, আবার কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করছেন। তাঁদের এই অবদান কেবল পারিবারিক উন্নয়ন নয়, জাতীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত অবদানের পরও গ্রামীণ নারীরা কি তাঁদের প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা পাচ্ছেন? বাস্তবতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা এখনো নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। মানসম্মত শিক্ষার সীমিত সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা, সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে অসচেতনতা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য তাঁদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক নারী পরিবারের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ অংশগ্রহণ করতে পারেন না। তাঁদের শ্রমকে অনেক সময় পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়, অর্থনৈতিক অবদান হিসেবে মূল্যায়ন করা হয় না।

গ্রামীণ নারীর প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই তাঁদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। কন্যাশিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা, ঝরে পড়া রোধ করা এবং নারীদের কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি কৃষি, পশুপালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহজ শর্তে ঋণ, ন্যায্য বাজারব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শসেবা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না; তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ এবং ন্যায্য মূল্য পাওয়ার ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, কৃষি বিভাগ, নারী ও শিশুবিষয়ক দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের তথ্য, বাজার ও সরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং আইনগত সহায়তা পাওয়ার পথ সহজ করাও জরুরি।

আমাদের শিবপুরসহ নরসিংদীর গ্রামীণ জনপদেও নারীদের সম্ভাবনা বিকাশের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। কৃষি, সবজি চাষ, পশুপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সেলাই, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, উৎপাদিত পণ্যের বাজার সৃষ্টি এবং তাঁদের সাফল্যকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নারীশিক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও অধিকারবিষয়ক আলোচনা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন শুধু সরকারি উদ্যোগ বা আর্থিক সহায়তার বিষয় নয়; এটি পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁদের কাজের মর্যাদা দিতে হবে। কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, গ্রামীণ নারীকে পিছনে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। যে নারী পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে শ্রম দেন এবং উৎপাদন ও আয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, তাঁর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এ দিবসের তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা শুভেচ্ছা প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। গ্রামীণ নারীর শ্রমের স্বীকৃতি, ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

গ্রামীণ নারী এগিয়ে গেলে এগিয়ে যাবে পরিবার, শক্তিশালী হবে গ্রামীণ অর্থনীতি, সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশ। আসুন, গ্রামীণ নারীর অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দিই এবং তাঁদের জন্য সমান সুযোগ, নিরাপত্তা ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়তে সম্মিলিতভাবে কাজ করি।

— সম্পাদকীয় বিভাগ
শিবপুর দর্পণ
শিবপুরের মাটি ও মানুষের কথা বলে।

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দৈনিক শিবপুর দর্পণ | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ